রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

(৪) কালজয়ী প্রতিভা শহীদ সাইয়েদ কুতুব শহীদ (রঃ)


যে মহান চিন্তানায়ক ইসলাম প্রতিষ্ঠা, প্রচার করার জন্য যে ত্যাগ কুরবানী স্বীকার করে আজও অমর হয়ে আছেন; তিনি হলেন কালজয়ী প্রতিভা, প্রখ্যাত মুফাসসির সাইয়েদ কুতুব শহীদ (রঃ)।







মায়ের নাম ফাতেমা হোসাইন ওসমান, পিতার নাম হাজী ইব্রাহিম কুতুব। তার নিজের সম্মানিত সাইয়েদ, কুতুব বংশীয় উপাধি। ১৯০৬ সালে মিসরের উসউত জেলার প্রাচীন পল্লী মুমায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর দাদার আমলে এই বংশের লোকেরা আরব উপদ্বীপ থেকে এসে মিসরের উত্তরাঞ্চলে বসবাস শুরু করেন। কেউ কেউ মনে করেন যে, তার পূর্বপুরুষকরা ছিলেন হিন্দুস্থানের অধিবাসী। অবশ্য এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য প্রমাণাদি নেই। পরিবারের সদস্য সংখ্যা সর্বমোট ৫ জন। মিসরের মাটিতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে গোটা পরিবারটাই ছিলো এক ইস্পাত কঠিন ঘাঁটি। তার ছোট ভাই মোহাম্মদ কুতুব নিজেও ছিলেন একজন মহান ব্যক্তি ও বহু গ্রন্থপ্রণেতা। বোন হামিদা ও আমিনা দু'জনই যালেমদের কারাগারে বহু অত্যাচার সয়ে এক সময় খাঁটি সোনায় পরিণত হয়েছেন।

শৈশবেই মায়ের ইচ্ছানুযায়ী তিনি কুরআন শরীফ মুখস্ত করেন গ্রামের মক্তবে। পরে পিতার সান্নিধ্যে চলে আসেন কায়রো শহরের উপকণ্ঠে হালওয়ান নামক স্থানে। সেখানে তিনি তাজহিজিয়াত দারুল উলুম মাদরাসায় পড়াশোনা শুরু করেন। ১৯২৯ সালে সেখানকার পড়াশোনা শেষ করেন। ১৯৩৩ সালে তিনি মাদরাসা দারুল উলুম কায়রো থেকে বিএ ডিগ্রী হাসিল করে আপন যোগ্যতার বলে সেখানে অধ্যাপনার কাজে নিযুক্ত হন। কিছুকাল পর তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্কুল ইন্সপেক্টর হিসেবে নিয়োগপত্র পান। এক পর্যায়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে উচ্চ শিক্ষার জন্যে তাকে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়। দু'বছর ধরে আধুনিক পৃথিবীর পাপের দেশে বাস করার সময় তিনি স্বচক্ষে দেখলেন যে, পাশ্চাত্য সভ্যতায় ধস নেমেছে। এই সর্বগ্রাসী ধস রুখতে হলে মানবজাতিকে পুনরায় আল্লাহর কেতাবের দিকে ফিরে না এসে কোনো উপায় নেই, এই পরিপক্ক ঈমান নিয়েই তিনি ১৯৪৫ সালে শহীদ হাসানুল বান্নার জেহাদী কাফেলা ইখওয়ানুল মোসলেমুনে যোগদান করেন।



১৯৫৪ সালে সাইয়েদ কুতুবকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর জেলে তার ওপর আনুমানিক নির্যাতন চালানো হয়। ফলে তিনি দারুণভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯৫৫ সালের মে মাসে তাকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়া হয়। একই বছরের ১৩ জুলাই তারিখে যখন তাকে ১৫ বছর কারাদন্ডের আদেশ দেয়া হয় তখন তিনি এতো অসুস্থ ছিলেন যে, সেই আদেশটি শোনার জন্য আদালতের কাঠগড়া পর্যন্ত পৌঁছাও তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। দশ বছরের ক্রমাগত শারীরিক ও মানসিক যুলুম নিপীড়নের পর ১৯৬৪ সালের এপ্রিল মাসে তিনি জেল থেকে মুক্তি লাভ করেন। তদানীন্তন ইরাকী প্রেসিডেন্ট আবদুস সালাম আরিফের ব্যক্তিগত অনুরোধে জামাল নাসের কিছুদিনের জন্য তাকে মুক্তি দিলেও সে তাকে আবার গ্রেফতারে নানা অজুহাত খুঁজতে থাকে।
মুক্তির পর তিনি কায়রোর উপকণ্ঠ ‘‘হলওয়ানে’’ অবস্থান করতে থাকেন। এখানে তাঁর সাথে যারা দেখা করতে আসতেন পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের লোকেরা তাদের ওপর কড়া দৃষ্টি রাখতে শুরু করেন। এ সময় অন্যান্য আরব দেশগুলো থেকে ইসলামী আন্দোলনের নেতারা পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা পাওয়ার জন্য তার কাছে ছুটে আসতেন। যালেম শাসকদের সাথে মোকাবেলা করে দেশে দেশে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে জোরদার করার বিষয়েই তারা তার সাথে আলোচনা করতেন। বলতে গেলে মধ্যপ্রাচ্যসহ সবকয়টি আরব ভূ-খন্ডের ইসলামী দলগুলোর জন্য সাইয়েদ কুতুব ছিলেন তখন প্রেরণার এক বিরাট উৎস। এটাই ফেরাউনের উত্তরসূরি নাসের চক্রের সহ্য হলো না। তারা ১৯৬৫ সালের আগস্ট মাসে তাঁকে পুনরায় কারারুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত করলো। গ্রেফতারী পরোয়ানা পড়েই তিনি স্পষ্টত নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, আমি জানি যালেমরা এবার আমার মাথাটাই চাইবে, এতে আমার কোনো দুঃখ নেই। নিজের মৃত্যুর জন্য আমার কোনো আক্ষেপ নেই। আমার তো বরং সৌভাগ্য যে, আল্লাহর রাস্তায় আমার জীবনের সমাপ্তি হতে যাচ্ছে। আগামীকালের ইতিহাসই এটা প্রমাণ করবে যে, ইখওয়ানুল মোসলেমুন সঠিক পথের অনুসারী ছিলো-না এই দিনের শাসকগোষ্ঠীর।’’

সাইয়েদ কুতুবের গ্রেফতারের সাথে সাথেই শুরু হলো দলীয় নেতা ও কর্মীদের ব্যাপক গ্রেফতার। লন্ডন থেকে প্রকাশিত ৬৫ সালের ১১ই অক্টোবর দৈনিক টেলিগ্রাফের মতে এই গ্রেফতারের সংখ্যা ছিলো ৪০ হাজারের ওপর। এদের মধ্যে ৭শ' ছিলেন মহিলা। গ্রেফতারের পর এই বিপুল সংখ্যক নেতা ও কর্মীদের ওপর নির্মম অত্যাচার চালানো হয়।



১৯৪৮ সালের ৮ ডিসেম্বর পশ্চিমী দুনিয়া বিশেষ করে বৃটিশদের ইশরায় সর্বপ্রথম ইখওয়ানকে বেআইনী ঘোষণা করা হয়। ইখওয়ানকে বেআইনী ঘোষণা করার নীলনকশা অাঁকা হয় লন্ডনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বৃটিশরা ওয়াদা করেছিলো, যুদ্ধ শেষে মিসরকে স্বাধীনতা দেয়া হবে। যুদ্ধ শেষ হবার পর যখন বৃটিশরা স্বাধীনতার প্রশ্নে টালবাহানা শুরু করলো তখন ইখওয়ান-এর বিরুদ্ধে প্রবল গণআন্দোলন গড়ে তোলে। অল্পদিনের মধ্যেই ইখওয়ানের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে উঠে গেল। সদস্য সংখ্যা দাঁড়ালো ২৫ লাখের উপরে। সমর্থক ও কর্মীর সংখ্যা ছিলো বহুগুণে। এরই মধ্যে লম্পট বাদশাহর লম্পট উযিরে আযমকে কে বা কারা গুলী করলে এই দোষ চাপানো হলো ইখওয়ানের ঘাড়ে। শুরু হলো ইখওয়ানীদের ওপর চরম নির্যাতনের পালা।
এর কিছুকাল পরে একদিন আলোচনার অজুহাতে এক বৈঠকের আয়োজন করলো কুচক্রীরা। রাস্তার মধ্যেই সরকারি খুনীদের হাতে শহীদ হলেন শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ইসলামী চিন্তাবিদ ইখওয়ানের কেন্দ্রীয় নেতা শহীদ হাসানুন বান্না। দিনটি ছিল ১৯৪৯ সালের ১২ মার্চ।
শাহাদাতের মর্যাদা দানকারী সে অমর পুস্তক :
আদালতের নাটকীয় প্রহসনে যে বই-এর ওপর কর্তৃপক্ষ অভিযোগ এনেছে তা হচ্ছে সাইয়েদ কুতুবের সেই বিখ্যাত বই ‘‘মায়ালেম ফিত তারীক।’’ (পথ চলার নির্দেশনাসমূহ) মোট ১৩টি অধ্যায়ে সমাপ্ত এই বই এর ৪টি অধ্যায়ই উদ্ধৃত করা হয়েছে শহীদের খ্যাতনামা তাফসীর ফী যিলালিল কুরআন’’ থেকে। কোনো অলস ও দুর্বল মনের মানুষকে ইসলামের প্রেরণায় উজ্জীবিত করে তোলার ব্যাপারে এই বইয়ের সত্যিই কোন জুড়ি নেই। ইতোমধ্যেই পৃথিবীর বহু ভাষায় এই গুরুত্বপূর্ণ বইটির অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে।





শহীদ সাইয়েদ কুতুব সাহিত্য সংস্কৃতির ময়দানে ইসলামী মূল্যবোধের ব্যাপক প্রচারের উদ্দেশ্যে বিশেষ করে আধুনিক শিক্ষিত লোকদের ইসলামের ছায়াতলে আনার জন্যে বহু মূল্যবান পুস্তক রচনা করেছেন। তাঁর রচনাবলীর মধ্যে ‘‘ফী যিলাযিল কোরআন’’ নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই মূল্যবান তাফসীর লিখে তিনি ইতিহাসের পাতায় সর্বদা স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
তার বিশেষ বিশেষ গ্রন্থের মধ্যে একাধিক উপন্যাস রয়েছে, বেশ কয়টি জনপ্রিয় শিশু সাহিত্যও রয়েছে। তেফলে মিনাল ক্বারিয়া (গ্রামের ছেলে), মদীনাতুল মাসহুর (যাদুনগরী), মাশাহেদুল কেয়ামাহ ফিল কোরআন (কোরআনে পেশ করা কেয়ামতের দৃশ্যসমূহ), আত্ তাসওয়ীরুল ফান্নি ফিল কোরআন-এ (শিল্পগত ছবি), আল আদালাতুল এজতেমায়ীয়াতু ফিল ইসলাম (ইসলামে সামাজিক সুবিচার), মা'রেকাতুল ইসলাম ওয়ার রেসমালিয়াহ (ইসলাম ও পুঁজিবাদের দ্বনদ্ব), আস সালামুল আলামে ওয়াল ইসলাম (ইসলাম ও বিশ্বশান্তি), দেরাসাতুল ইসলামিয়াহ (ইসলামী রচনাবলী), আন নাকদুল আদাবে-উসুলুহ ও মানাহেজুহ (সাহিত্য সমালোচনার মূলনীতি ও পদ্ধতি), আননাকদু লে কেতাবে মুসতাক বেলেস সাকাফাহ (ভবিষ্যতের সংস্কৃতি শীর্ষক একটি পুস্তকের সমালোচনা), কেতাবুন ও শাখদিয়াতুন (গ্রন্থ ও তার ব্যক্তিত্ব), নাহয়ু মুজতামেয়ূল ইসলাম (ইসলামী সমাজের দৃশ্য), আমরিকা আললাতি রাআইতু (আমেরিকা যাকে আমি দেখেছি), আল আতাইয়াকুল আরবা (চারজনের চিন্তাধারা)। সর্বশেষে রয়েছে তাঁর সেই মহাবিপ্লবের গ্রন্থ ‘‘মায়ালেম ফিত তারীক’’ (পথচলার নির্দেশনাসমূহ)। এই গ্রন্থের মাঝেই শহীদ কুতুব দেশ, জাতি নির্বিশেষে দুনিয়ার সকল মুসলমানকে আহবান জানিয়েছেন নিজেদের ঘাড় থেকেই জাহেলিয়াতের সব ধরনের বোঝা ঝেড়ে ফেলে দিতে এবং দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের জন্যে আল কুরআনের ঝান্ডা হাতে নিয়ে যালেমদের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে। সমস্ত যালেম মোনাফেক শাসকদের উৎখাত করে তার স্থলে সত্যিকার অর্থে আল্লাহর দ্বীন কায়েমের জেহাদে শরীক হতে তাদের ডাক দিয়েছেন। তাঁর দাওয়াত, কর্মপন্থা, লেখনী, ইসলামী আন্দোলনকে এক নবদিগন্তে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছিল। আল্লাহ পাক তাকে উত্তম জাযা দান করুন। আমিন।




মাওলানা শাহ্ মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান ।।
-কলামিস্ট, লেখক, সিনিয়র শিক্ষক দোলাইরপাড় উচ্চ বিদ্যালয়, ঢাকা-১২০৪।

post

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন